বিধান রিবেরু

bidhanrebeiro.wordpress.com

সেমবেন, হালা, মালভের প্রবন্ধ ও একটি গ্রন্থ

।। নাবীল অনুসূর্য।।
Ousmane-Sembene
এক চিত্রপরিচালক তাঁর একটি চলচ্চিত্র নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে বলেছিলেন, এসব জায়গা হচ্ছে নয়া উপনিবেশবাদের প্রান্তিক সীমানা, সেখান থেকেই বিপদের উত্পত্তি। এসব জায়গার লোকেরাই যখন সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হয়, তখন দেখা যায় তারা দেশের জাতীয় ভাষাটাই জানেন না, তারা একধরনের বিচ্ছিন্নই বলা যায়, ভেতরে ভেতরে তারা পরাধীন বা কলোনাইজড। তারাই কিন্তু বুলি আওড়ান— মানুষের মনকে উপনিবেশবাদ থেকে মুক্ত হতে হবে, আসলে অন্যদের নয়, তাদের নিজের মানসিকতারই মুক্তি দরকার। পড়লে মনে হতে পারে, এটা আমাদের দেশের, বা এই উপমহাদেশের কোনো চিত্রপরিচালকের সাক্ষাত্কার থেকে টুকে নেয়া অংশ। বাস্তবতা হলো, কথাগুলো বহুদূরবর্তী এক দেশের, একেবারেই ভিন্ন মহাদেশের এক পরিচালকের কথা। তাঁর নাম উসমান সেমবেন।
সেনেগালের অন্যতম এই চিত্রপরিচালককে বলা হয় আফ্রিকার আধুনিক চলচ্চিত্রের জনক। অবশ্য চিত্রপরিচালকের আগে তিনি ঔপন্যাসিক। পরে হাত লাগান চলচ্চিত্র পরিচালনায়। এখানে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই মিলে যায় আমাদের পরিচিত একজন নমস্য পরিচালকের সঙ্গে— ঋত্বিক কুমার ঘটক। ঋত্বিকের মতো তিনিও গণমানুষের কাছে পৌঁছানোর তাড়না থেকেই এসেছিলেন চলচ্চিত্রে। উপলব্ধি করেছিলেন, আফ্রিকায় শিক্ষার যে হার, তাতে ওখানে শৈল্পিক উপায়ে নিজের কথা বলতে হলে, সেটার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম উপন্যাস হবে না, হবে চলচ্চিত্র। অবশ্য তাঁর কাছে সিনেমা ও সাহিত্য (উপন্যাস) খুবই কাছাকাছি বিষয়—‘যখন আমি লিখি, তখন এর শেষ পরিণতি চলচ্চিত্র হবে বলেই আশা রাখি। আমি এমন শব্দ খুঁজি যা প্রতিচ্ছায়া হতে পারে, এমন প্রতিচ্ছায়া খুঁজি যেন তা শব্দে রূপ নিতে পারে, এমনটা করি যেন  যে কেউ চলচ্চিত্র পাঠ করতে পারে আর দেখতে পারে বই। কিন্তু আমি সিনেমার প্রতি আগ্রহী হয়েছি কারণ সিনেমা বইকে অতিক্রম করতে পারে,  এমনকি কবিতা কিংবা মঞ্চ নাটককেও। যখন “হালা” মুক্তি পেল তখন প্রত্যেক সন্ধ্যায় কমপক্ষে তিনশ’ মানুষ ছবিটি দেখতে এসেছেন, তাদের সঙ্গে ছোট ছোট দলে আমি তর্কে মেতে উঠতাম।’
এই ‘হালা’ চলচ্চিত্রটি উসমান সেমবেনের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র না হলেও, সেরা চলচ্চিত্রগুলোর কাতারে পড়ে। তাঁর ভাষায়, এই চলচ্চিত্রটি একধরনের রূপক। অথবা আরো নির্দিষ্ট করে বললে একটি রূপকথা। যে রূপকথায় চিত্রিত হয়েছে আফ্রিকায় শ্রেণিসংগ্রামের সূচনা। পুরো চলচ্চিত্র জুড়ে হাস্যরসকে ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়েছে সেনেগালের সমকালীন বাস্তবতার রূপক চিত্র। আর শেষ দৃশ্যে সে বাস্তবতার ভিত্তিতে গড়ে তোলা হয়েছে রূপকথা—বিপ্লবের আহ্বান। আর গণমানুষও চলচ্চিত্রটিকে গ্রহণ করেছিল সাদরে। দশ জায়গায় কর্তনের পরও মানুষ সেটা দেখতে গিয়েছিল, বাদ দেয়া জায়গাগুলো নিজেরাই পূরণ করে নিয়েছিল।
উসমান সেমবেন ‘হালা’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন তাঁর নিজের একই নামের উপন্যাস থেকে।  সেই চলচ্চিত্রটি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন ব্রিটিশ চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক লরা মালভে, ১৯৯১ সালে,  আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক জার্নাল থার্ড টেক্সটে। মূলত সেটার অনুবাদ করতে গিয়েই বিধান রিবেরুর ‘উসমান সেমবেনের চলচ্চিত্র হালা’র আত্মপ্রকাশের আরম্ভ। ছবির লড়াই নামের একটি সংগঠন আফ্রিকার চলচ্চিত্রের ওপর একটি সংকলনের কাজ শুরু করলে, লেখকের কাঁধে আসে লরা মালভের সেই লেখাটি অনুবাদের দায়িত্ব। তিনি সে দায়িত্ব পালন করেন বটে,  কিন্তু শেষতক সেই সংকলনটিই আর আলোর মুখ দেখেনি। সেই ফাঁকে আত্মপ্রকাশ ঘটে এই সুশ্রী বইটির। লরা মালভের সেই প্রবন্ধের সাথে গ্রন্থটিতে জুড়ে দেয়া হয়েছে ‘হালা’ নিয়ে উসমান সেমবেনের একটি সাক্ষাত্কার। সঙ্গে পরিচালকের একটা ক্ষুদ্র জীবনীও যোগ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে আফ্রিকা বিশেষজ্ঞ ও চলচ্চিত্রসমালোচক ধ্রুব গুপ্ত-র ‘সেলুলয়েডের ফিতেয় আফ্রিকা’ প্রবন্ধটিও জুড়ে দেয়া হয়েছে, পাঠককে একটা সামগ্রিক পাঠের আস্বাদন দিতে।
বইটির মূল মশলা, লরা মালভের প্রবন্ধটি। এই প্রবন্ধটি অবশ্য লরা মালভের সর্বাধিক পঠিত নয়, সে কৃতিত্ব ‘ভিজুয়াল প্লেজার অ্যান্ড ন্যারেটিভ সিনেমা’ শীর্ষক প্রবন্ধের। তবে এটি যে তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ, তাতে সন্দেহ নেই।
‘হালা’র উপজীব্য ও প্রবণতা অনুধাবনে এই সাক্ষাত্কারটিও বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। এই দুটিই মূলত অনুবাদ। আর বিধান রিবেরুর হাতে সে দুটো অনুবাদ ভীষণই প্রাঞ্জল হয়েছে। পড়তে গিয়ে কখনোই মনে হয় না, লেখাটি পড়া হচ্ছে দ্বিতীয় ভাষায়, মূল ভাষায় নয়। দ্বিতীয়সহপাঠ, অর্থাত্ উসমান সেমবেনের সংক্ষিপ্ত জীবনীটিও সুলিখিত ও সুসজ্জিত। তাঁর জীবনকে কতগুলো পর্বে বিভক্ত করে আলোচনা করা, শেষে তাঁর পুরস্কার-সম্মাননা-চলচ্চিত্রের তালিকা প্রণয়ন, প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় বিভিন্ন সাক্ষাত্কার থেকে উদ্ধৃতি প্রদান প্রভৃতির মাধ্যমে ‘উসমান সেমবেনের লড়াকু জীবন’ শীর্ষক অধ্যায়টিও বেশ সুখপাঠ্য। আর সংবর্ধনা শিরোনামে সংযুত্ত ধ্রুব গুপ্তের রচনা সম্পর্কে লেখক নিজেই কবুল করেছেন, ধ্রুব গুপ্তের ওই  লেখার কারণেই তিনি নিজে আর দক্ষিণ আফ্রিকার চলচ্চিত্রের উন্মেষ নিয়ে কথা বলেননি।
সংকলনধর্মী বইটাতে লেখকের কাজ ছিল অনেকটাই তর্জমা-নির্ভর ও সম্পাদকীয় ঘরানার। সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রাখার সুযোগ ছিল কম। কিন্তু সে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিধান রিবেরু খানিকটা সৃষ্টিশীলতার ছাপ রেখেছেন শিরোনাম দিতে গিয়ে, যদিও মূলত তর্জমা বলে সেখানেও স্বাধীনতা ছিল কম। কেবল স্বাধীনতা ছিল ভূমিকা রচনায়।
সব মিলিয়ে ‘উসমান সেমবেনের চলচ্চিত্র হালা’ বইটি তাদের জন্যই কেবল, যারা হালা চলচ্চিত্রটি দেখেছেন। তবে বিপরীতটাও মিথ্যে নয়, চাইলে এই বইটি পড়ার জন্যও ‘হালা’ দেখা যেতে পারে। তাতে ক্ষতি নেই, বরং লাভ ষোল আনা। একটি ভালো চলচ্চিত্র দেখা হবে, ভালো পরিচালককে জানা হবে, উপরন্তু আফ্রিকার চলচ্চিত্র সম্পর্কে একটা খসড়া ধারণাও পাওয়া যাবে।
(লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ইত্তেফাক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে, ৩১ মার্চ ২০১৭।)
Ittefaq Xala review
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

Information

This entry was posted on এপ্রিল 1, 2017 by in তাঁদের বয়ানে.

নেভিগেশন

%d bloggers like this: