বিধান রিবেরু

bidhanrebeiro.wordpress.com

সত্যজিতের কলকাতা ত্রয়ী: আগন্তুকের চোখে রাজনীতি

— বিধান রিবেরু —

Ray

অন্যান্য দেশের বৈপ্লবিক অবস্থাও এদেশে একটা অভিঘাত আনে। বিশেষ করে দুটি সংগ্রাম ভারতের জনসাধারণকে খুবই প্রভাবিত করে। একটা হলো ভিয়েতনামের জনগণের মৃত্যুঞ্জয়ী বীরত্ব। …দ্বিতীয় সংগ্রামটি ছিলো চীনের মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লব…’ –সুনীতি কুমার ঘোষ

সত্যজিৎবাবু বামপন্থী ছিলেন বলে জানি না। বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে ওঁর যোগ ছিল বলেও শুনিনি। উনি প্রগতিশীল ছিলেন। ওঁর নতুন চিন্তাধারায় সব কয়টি ছবিতে প্রগতিশীলতার মনোভাব পরিষ্কার ফুটে উঠেছে।’ –জ্যোতি বসু

সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’(১৯৭০), ‘সীমাবদ্ধ’(১৯৭১) ও ‘জন-অরণ্য’(১৯৭৫) এই তিনটি চলচ্চিত্র কলকাতা ত্রয়ী বা ট্রিলজি নামে পরিচিত, অনেকে আবার এই তিনটি ছবিকে সত্যজিতের ‘রাজনৈতিক চিত্রত্রয়ী’ হিসেবেও বিবেচনা করে থাকেন। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছবির মূল চরিত্রের নাম সিদ্ধার্থ চৌধুরী (ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়), ‘সীমাবদ্ধ’ ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জি (বরুণ চন্দ) আর ‘জন-অরণ্য’ ছবিতে মূখ্য চরিত্রের নাম সোমনাথ (প্রদীপ মুখোপাধ্যায়)। এই তিন চরিত্রকে কেন্দ্র করে সত্যজিতের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা রাজনীতির প্রতি তাঁর মনোভাবকে খোঁজাই এই রচনার উদ্দেশ্য। তবে মনে রাখা দরকার যেহেতু এই তিন ছবির প্রেক্ষাপট ষাট-সত্তরের দশক আর ছবিগুলো মুক্তিও পেয়েছে সত্তরের দশকে তাই সমকাল নিয়ে কিঞ্চিত আলাপ করলে সেটা অপ্রয়োজনীয় হবে না।

এক.
সত্যজিৎ রায় এমন এক সময়ে এই তিনটি ছবির প্রস্তুতি নিচ্ছেন ও মুক্তি দিচ্ছেন যখন শুধু ভারতবর্ষ কেন, প্রতিবেশি বাংলাদেশ (তখন পূর্ব পাকিস্তান), চীন, পাকিস্তান এমনকি গোটা পৃথিবীতেই চলছে এক রাজনৈতিক অস্থিরতা। দেশে দেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছে। কোন কোন দেশ সাম্রাজ্যবাদের নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। জাতিতে জাতিতে বেধে যাচ্ছে যুদ্ধ। খোদ ভারতই ১৯৬২ সালে চীনের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৫ সালে ভারতকে যুদ্ধ করতে হয় পাকিস্তানের সঙ্গে। পাশের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার জন্য ফুঁসছে। এমনই এক পরিস্থিতিতে ভারতের ভেতর আগে থেকেই এক অসন্তোষ দানা বাধতে শুরু করেছিল, ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে, তাদের নানা ‘দেশ বিরোধী নীতি’র ফলে। যেমন দেশ ভাগের পরপরই সদ্য সাবেক শাসক ব্রিটিশদের চাপে নিজেদের মুদ্রার মান কমিয়ে ফেলা, নিজেদের তিন সামরিক বাহিনীতেই প্রধানের দায়িত্বে ব্রিটিশদের রেখে দেয়া, ব্রিটিশদের প্রণীত সংবিধানের প্রায় পুরোটাই গ্রহণ করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা ইত্যাদি।

‘ইন্ডিয়াস পলিটিক্যাল ইকনমি ১৯৪৭-৭৭’ বইতে অধ্যাপক ও লেখক ফ্রান্সিন ফ্রাঙ্কেল লিখছেন, ‘১৯৬০-এর শেষ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত (ভারতে) ক্রমাগত খাদ্য ঘাটতি ছিলো, ছিলো মুদ্রাস্ফীতিজনিত মূল্যের উর্ধ্বমুখী গতি, কাঁচামাল পাওয়া যেতো কম, শিল্পোৎপাদন ছিলো কম, ভোগ্যপণ্য শিল্পে অব্যবহৃত ক্ষমতা ছিলো প্রচুর, সরকারি লগ্নি বাড়ছিলো না, কখনো কখনো কমছিলো, খাদ্যশস্য ও কাঁচামাল আমদানি করতেই মহার্ঘ বিদেশী মুদ্রা ব্যয়িত হয়ে যেতো।” এমন অবস্থার মধ্যেই ১৯৬৭ সালে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটল ভারতের দার্জিলিং জেলায়। সেখানকার নকশালবাড়ি ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামে ঘটে কৃষকদের অভ্যুত্থান। গ্রামের সামন্তবাদীদের শাসনের অবসানের জন্য কৃষকদের এই জেগে ওঠার জোয়ার এসে আছড়ে ভারতের বিভিন্ন জায়গায়, সেগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা একটি। ওই একই সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন হয়। তাতে সিপিআই ও সিপিআই-এমের যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়। নকশালবাড়ি আন্দোলন আর তার জোয়ার যা আন্দোলিত করছিল কলকাতাকে তার নেপথ্যে ছিল আরেক বামপন্থী দল, চারু মজুমদারের সিপিআই-এমএল।

১৯৬৭ সালের জুলাই মাস থেকেই নকশালবাড়ি আন্দোলনকে দমন করার জন্য ভয়ানক সাড়াশি অভিযান শুরু করে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার। নিপীড়নমূলক সেই পুলিশি অভিযানের সাংকেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন ক্রসবো’। তো এই অভিযানে অনেকে হতাহত হলেও নকশালবাড়ি আন্দোলন আরো জায়গা করে নিচ্ছিল শহুরে শিক্ষিত তরুণদের হৃদয়ে। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে কলকাতায়- যুবসম্প্রদায় যখন সংঘবদ্ধ হতে থাকে। ভুলে গেলে চলবে না সেসময় সারা দেশে চলছে খাদ্যসঙ্কট, আর বেকারত্বের ভারী বোঝা যেন পিষে ফেলছিল তরুণদের। এমনই এক বিস্ফোরক মুহূর্তে সাম্রাজ্যবাদের দালাল বা মুৎসুদ্দিদের পরাজিত করার এক লড়াই সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় তরুণরা, যা যুববিদ্রোহ নামে পরিচিতি পায় পশ্চিমবঙ্গে। এসময় ঔপনিবেশিক ও আধাসামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থাকে গুড়িয়ে দিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা চালাতে শুরু করে তরুণরা। আর রাতের অন্ধকারে দেয়ালে দেয়ালে পড়তে থাকে বিপ্লবী চিকা আর মাও সেতুঙের স্টেনসিল করা আবক্ষ মূর্তি। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে এসব করতে হত যুবক ও ছাত্রদের। কারণ ধরা পড়লে বরাদ্দ থাকত প্রশাসনের গুলি। বহু মূল্যবান প্রাণ সেসময় অকালেই ঝরে যায়।

পুলিশ ও প্যারা-মিলিটারি ফোর্সের হাতে গণহারে প্রাণ হারাতে দেখে সিপিআই-এমএল কলকাতায় তাদের কার্যক্রম আরো জোরালো করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭০ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত এক ইস্তেহারে ওই পার্টির পক্ষ থেকে পুলিশকে আহ্বান করা হয়, তারাও যেন নিজেদের জনগণের কাতারে সামিল করে ও বিদ্রোহে অংশ নেয়। শ্রমিক ও কৃষকদের নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র গঠনের সেই আহ্বানে স্বভাবতই পুলিশ বা প্রশাসন সাড়া দেয়নি। কাজেই কলকাতা তখন পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। অনেকেই এই সময়ে পুলিশের ভূমিকাকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দেন। ১৯৭১ সালের শেষের দিকে নিহতের সংখ্যা কয়েক সহস্রে পৌঁছায় আর রাজনৈতিক বন্দির সংখ্যা হয় লক্ষাধিক। এ বছরের ১২ ও ১৩ আগস্ট, এই দুই দিনেই হত্যা করা হয় অন্তত ১৫০ জনকে। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয় এদের মারা হয়েছে কারণ এরা ছিলেন প্রথাবিরোধী ও নকশালপন্থী। আবার নিহতদের সকলে সিপিআই-এমএলের রাজনীতিতে সক্রিয়ও ছিলেন না।

১৯৭১ সালে কলকাতায় যখন প্রশাসনের বিশেষ সব অভিযান চলছিল তখন বাংলাদেশ থেকে কয়েক লক্ষ্য শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে ভারতীয় সীমান্ত অঞ্চলে, অনেকেই আবার কলকাতা ও এর আশপাশের এলাকায় গড়ে তোলে অস্থায়ী আবাস। পরিস্থিতি তখন যথেষ্ট জটিল হয়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের এই নকশালপন্থী যুববিদ্রোহ ১৯৭২ সালের পর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় প্রশাসন। তবে এই যে বিপুল আন্দোলন সেটা যে সফল হয়নি তার কারণ বেশ চমৎকার ভাবেই দিয়েছেন তৎকালে সিপিআই-এমএলের সক্রিয় নেতা সুনীতি কুমার ঘোষ। তাঁর উদ্ধৃতি দিয়েই শেষ করবো এই অংশ। সুনীতি কুমার বলছেন-

‘সংগঠিত ছাত্রদের বিপুল শক্তিকে লালন করা হল না; সুস্পষ্ট নীতির অভাবে সেই শক্তি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। নকশালবাড়ির আহ্বানে কলকাতার হাজার হাজার ছাত্র ও যুবক সাড়া দিয়েছিল। কিন্তু তাদের সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে কোনও স্থির পদক্ষেপ গ্রহণই করা হল না; মার্কস-লেনিন-মাও সেতুং-এর ভাবনায় তাদের দীক্ষিত করার কোনও প্রচেষ্টাই গ্রহণ করা হল না। একটি রাজনৈতিক ক্লাসও নেওয়া হয় নি। বরং মার্কসীয় ধ্রুপদী সাহিত্য পড়া নিরুৎসাহিত করা হয়। ফলত, ছাত্র ও যুব সম্প্রদায়ের সংগ্রাম কখনওই অন্যান্য শোষিত শ্রেণীর, বিশেষত কৃষকদের সঙ্গে একীভূত হয় নি। জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবে তাদের এই বিপুল আত্মত্যাগ তাই বিশেষ সহায়তা করতে পারে নি।’

দুই.

একজন শিল্পী বাস্তবকে নিজের আদর্শিক ও শ্রেণীগত অবস্থান থেকে বিবেচনাতে নেন এবং পরে সেটিকে ভিত্তি করে শিল্প সৃষ্টি করেন। সত্যজিতের আলোচ্য রাজনৈতিক ত্রয়ীর বেলাতেও তাই ঘটেছে। এক্ষেত্রে দুটি দিক আমরা পাশাপাশি দেখবো- এক, তাঁর সৃষ্টি, বিশেষ করে এই তিন ছবিতে রাজনীতির প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং দুই, সত্যজিতের রাজনীতি ভাবনা, যা বিভিন্ন সময়ে নেয়া সাক্ষাৎকারে প্রকাশ পেয়েছে।

সৃষ্টি ও কথা থেকে যেটুকু বোঝা যায় তা হল- সত্যজিতের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি উদারনৈতিক এবং সেখানে রয়েছে অভিজাত শ্রেণীর রাজনীতি বিমুখ প্রবণতা। এই প্রস্তাবকে ধরেই আমরা এবার সামনে এগুবো।

তিন.

প্রতিদ্বন্দ্বী ছবির একটি দৃশ্য‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র যা মুক্তি পায় ১৯৭০ সালে। এই ছবি শুরু হয় নেগেটিভ ইমেজ দিয়ে, এই দৃশ্যে সিদ্ধার্থের বাবার মৃত্যু দেখানো হয়। নেগেটিভ ইমেজের মাধ্যমে দর্শক বুঝতে পারে এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সিদ্ধার্থের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। বন্ধ হয়ে যায় মেডিকেলে পড়ালেখা, সংসারের বড় ছেলে হিসেবে দায়িত্ব এসে পড়ে ঘাড়ে। শুরু হয় হন্যে হয়ে চাকরি খোঁজা। একের পর এক সাক্ষাৎকার দিয়ে যায় সিদ্ধার্থ, কিন্তু লাখ লাখ দরখাস্তের বিপরীতে, উদ্ভট প্রশ্নে জেরবার হয়ে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরতে হয় বাড়ি।
চাকরির এক সাক্ষাৎকারে সিদ্ধার্থকে একবার জিজ্ঞেস করা হল শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা কোনটি? সিদ্ধার্থ অল্প সময়ের মধ্যেই উত্তর দিল ‘ভিয়েতনামের যুদ্ধ’। চাকরিদাতাদের পাল্টা প্রশ্ন- ‘মানুষের চন্দ্রাবতরণ নয় কেন?’ জবাবে সিদ্ধার্থ বলে, বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে মানুষ তো একদিন চাঁদে যেতই, কিন্তু ভিয়েতনামে সাধারণ মানুষ যা করে দেখাল তা আশ্চর্য হওয়ার মতই ঘটনা। সিদ্ধার্থ বুঝাতে চাইল যুক্তরাষ্ট্রের মত পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে শুধু মনোবল দিয়েই হটিয়ে দিয়েছে ভিয়েতনামের মানুষ। এজন্যই এটাকে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঘটনা বলে মনে করে সিদ্ধার্থ। তার এই জবাব দেখে প্রশ্নকর্তারা সন্দেহ করে বসেন নিশ্চয় সিদ্ধার্থ বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। চাকরিটি শেষ পর্যন্ত সিদ্ধার্থের হয়নি।

এই প্রবন্ধের শুরুতেই বলেছিলাম ষাট-সত্তরের দশকে দুটি বিষয় সমকালের তরুণদের নাড়া দিয়েছিল- একটি ভিয়েতনামের যুদ্ধ, আরেকটি চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এই দুটি ঘটনা থেকেই পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের যুবকরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তারাও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ছায়া ও নব্য পুঁজিবাদের হাত থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারবে। কিন্তু তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল। সিদ্ধার্থের স্বপ্ন অবশ্য বিপ্লব করার দিকে ছিল না। তবে বিপ্লবের একটা প্রয়োজন বোধ করত সে। তাই তাকে বলতে শোনা যায় ‘শালা বিপ্লব না হলে কিসসু হবে না’, সিদ্ধার্থ বিপ্লব চায় কারণ তার লেখাপড়া হয়নি, তার পরিবারে দারিদ্র ভর করেছে এবং সর্বশেষ তার কোন কাজ নেই, সে বেকার। সিদ্ধার্থের এই পরোক্ষভাবে বিপ্লবের সমর্থন করার প্রমাণ পাওয়া যায় তার বাসাতেই। তার ছোট ভাই টুলু আবার সরাসরি রাজনীতির সাথে যুক্ত। সে জানে বিপ্লব ছাড়া গতি নাই। তাই সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র রাখে, গ্রামে যেতে চায়, যুক্ত হতে চায় কৃষকদের সাথে। না বললেও বোঝা যায় নকশালবাড়ির আন্দোলনে যুক্ত ছিল এই টুলু। ছোট ভাইটিকে সিদ্ধার্থই একসময় চে গেভারার বই কিনে দিয়েছিল, নিজেও মনে করে বিপ্লব না হলে কিছুই হবে না, তারপরও সে সক্রিয় হতে পারে না। আর তার এই নিষ্ক্রিয়তাকে ছোট ভাই টুলু পরিমার্জিত ভাষায় ধিক্কার জানায়। তারপরও সিদ্ধার্থের চেতনার পরিবর্তন হয় না। কারণ সে প্রচণ্ড রকমভাবে আত্মকেন্দ্রিক। আর এই আত্মকেন্দ্রিক চরিত্রকেই সত্যজিৎ রায় মনে করতেন চিত্তাকর্ষক।

এক সাক্ষাৎকারে ক্রিশ্চিয়ান থমসন প্রশ্ন করেছিলেন- ‘যদি আপনি সত্যিকার রাজনৈতিক ছবিই করবেন ঠিক করেছিলেন তাহলে এই রাজনৈতিক চরিত্র টুলুকে কেন্দ্রীয় চরিত্র কেন করলেন না?’ উত্তরে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন- ‘কেন-না নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্বাস (লাইন) আছে এমন একটি ব্যক্তি প্রায়শই মনস্তাত্ত্বিক ভাবে কম চিত্তাকর্ষক হয়। বিপ্লবীরা সব সময়ে নিজেদের নিয়ে ভাবে না। আমি বরং সেই যুবকটির (সিদ্ধার্থের) প্রতি বেশি আগ্রহী যার কোনো দৃঢ় রাজনৈতিক বিশ্বাস নেই, সে চায় চাকরি, তা যে-কোনো রাজত্বেই হোক না কেন। সে ভাবে তার নিজের কথা এবং সে জন্য সে কষ্ট পায়।’

রাজনীতিকে বলতে গেলে একটু অপছন্দই করতেন সত্যজিৎ। এমনকি ষাট দশকের শেষের দিকে নকশালবাড়ির আন্দোলনকে আরো বেশি অপছন্দ করতেন এই বলে যে এটা না কি ছিল বামপন্থীদের ভেতরকার দ্বন্দ্ব। ১৯৭২-৭৩ সালের সাইট অ্যান্ড সাউন্ডে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ বলেন, ‘দুঃখদায়ক ঘটনা এটাই যে বামপন্থী আন্দোলন বিভিন্ন দলে বিভক্ত, এবং তারা একে অপরের শত্রু। তারা উদারপন্থী বা সংরক্ষণপন্থীদের আক্রমণ করে না, তারা প্রকৃত শত্রুকে আক্রমণ করে না। পরিবর্তে তারা পরস্পর পরস্পকে আক্রমণ করে।’ অথচ সত্যজিৎ বুঝতেই পারেননি যুক্তফ্রন্টের ভেতর ঢুকে পড়া কমিউনিস্টরা আর সে অর্থে বামপন্থী ছিল না। তারা হয়ে গিয়েছিল শোধনবাদী, শোষিতের পক্ষের রাজনীতি করলে নকশালবাড়ির কৃষকদের পক্ষেই অবস্থান থাকতো তাদের। সিপিআই ও সিপিআই-এমের এমন চরিত্রের কারণেই সিপিআই-এমএলের জন্ম, তারা বিশ্বাস করত সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে। কেন এই আন্দোলন ব্যর্থ হল সেটি স্বতন্ত্র আলাপ, তবে আন্দোলনের আদর্শিক এসব দ্বন্দ্ব বোঝা দূরে থাক তিনটি বামপন্থী দল থাকার অর্থই খুঁজে পাননি সত্যজিৎ। একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, ‘আমার সবসময় মনে হয় ভারতে রাজনীতিটা একটা অস্থায়ী ব্যাপার, রাজনৈতিক দলগুলো খুব তাড়াতাড়ি ভেঙ্গে যায়। এবং আমি বিশ্বাস করি না যে বামপন্থী দল বলে তেমন কিছু আর আছে। ভারতে এখন তিনটে কম্যুনিস্ট পার্টি, আর আমি তার কোন মানে খুঁজে পাই না।’

বামপন্থী দলগুলোকে অপছন্দের কারণেই কি বামপন্থীদের পাগল হিসেবে সাব্যস্ত করেছিলেন ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ চলচ্চিত্রে? সরাসরি করেননি কিন্তু ইঙ্গিতে করেছেন। খেয়াল করলে দেখবেন সিদ্ধার্থ যখন প্রেক্ষাগৃহে যায় তখন পর্দায় চলছিল এক প্রামাণ্যচিত্র। সেখানে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের কর থেকে আদায়কৃত অর্থ ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বয়ান দেয়া হচ্ছিল এবং ইন্দিরা গান্ধীকে দেখানো হচ্ছিল। সিদ্ধার্থ বোধহয় হলে যায় একটু বিশ্রাম নিতে, তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার সাথে সাথেই বোমা বিস্ফোরণ হয় হলে। আমরা জানি, সেসময়টায় নকশালপন্থী যুববিদ্রোহ চলছে, তরুণরা পুঁজিবাদী শাসন অবসানের লক্ষ্যে বিভিন্ন জায়গায় এমন হামলা চালাচ্ছে।

চীন বিরোধী একটি হিন্দি ছবি ‘প্রেম পূজারী’র প্রদর্শন ১৯৭০ সালের ৩ মার্চ বন্ধ করে দেয় নকশালপন্থী ছাত্ররা। উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার তিনটি সিনেমা হলে গেরিলা পদ্ধতিতে রেডগার্ড, অর্থাৎ নকশালপন্থী যুবকরা ঢুকে সিনেমার পর্দা পুড়িয়ে দেয়। এমন একটি হামলাই দেখা যায় সত্যজিতের ছবিতে। পরিচালক যে এই হামলার দায় সিপিআই-এমএলেরই ঘাড়ে চাপাচ্ছেন সেটা আর আলাদা করে বুঝিয়ে দেয়ার দরকার নেই। কিন্তু লক্ষ্য করবেন, হামলার পর বেশ হালকা চালে বাইরে বেরিয়ে আসে সিদ্ধার্থ। তখন এক পাগল গোছের লোক তার মুখোমুখি হয়, কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য, চট করেই তখন দেখা যায় সিদ্ধার্থের হাতের ঘড়িটি ফিতা ছিঁড়ে মাটিতে পড়ে যায়। পাগলটিই বা ওইখানে এল কেন আর ঘড়িটাই বা ছিঁড়ে পড়ল কেন? বোমাটি কি তবে পাগলটাই ছুড়েছিল? এমন একটা প্রশ্ন কিন্তু মাথায় আসে। এই প্রশ্ন তৈরি হওয়ার সুযোগ করে দিয়ে সত্যজিৎ কি নকশালপন্থীদের সঙ্গে পাগলের তুলনা করলেন না? নাও করতে পারেন। আবার করতেও পারেন। আর হাতের ঘড়ি ছিড়ে পড়ে যাওয়ার মানে যদি এটা করি- এসব পাগলদের রাজনীতিতে সময় ক্ষেপন করার সময় সিদ্ধার্থের ওরফে সত্যজিতের নেই- তাহলে কি খুব বেশি ভুল বলা হবে, অন্তত উল্লিখিত সাক্ষাৎকারটিকে যদি আমলে নেই?

তারপরও প্রায় দুই যুগ পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী থাকা অবস্থায় মার্ক্সবাদী নেতা জ্যোতি বসু বলছেন সত্যজিৎ বামপন্থী ছিলেন কি না তা তিনি জানেন না, তবে প্রগতিশীল ছিলেন। এই কথা তিনি বলেছিলেন ১৯৯৮ সালে। আমি বলি প্রগতিশীল নয়, কঠিন করে বললে তিনি ছিলেন আত্মকেন্দ্রিক রোমান্টিক এক মানুষ। যে কি না নিজেকে ঘিরেই বাঁচতে চাইতেন। অনেকটা সিদ্ধার্থের মত। সিদ্ধার্থ যেমন নিজেকে কল্পনায় চে ভেবেই খালাস, কিন্তু ময়দানে নেমে লড়াই করাটা তার হয়ে ওঠে না, সত্যজিৎও যেন তেমনই। সিনেমা করেই শেষ, কোন রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি শরীক হন নি।

কল্পনাতেই সিদ্ধার্থের চে সাজা, কল্পনাতেই সিদ্ধার্থের গুলি করা বোনের অফিসের বস সান্যালকে। সমাজবিরোধী উপাদান আখ্যা দিয়ে সেই বসকে অপমান করতে গিয়েও বুর্জোয়া শানশওকত দেখে সে আর প্রতিবাদ করতে পারে না। কারণ সামনে থাকে চাকরির প্রলোভন। যদি এই ভদ্রলোক একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেন! আবার লোকটা বোনের দারিদ্র্যের সুযোগ নিচ্ছে সেটাও সহ্য হয় না সিদ্ধার্থের। তাই বেরিয়ে যায় সে, প্রতিবাদ আর জানানো হয় না। প্রতিবাদ প্রকাশ পায় অন্যত্র, তার চেয়েও দুর্বল এক গরীবের উপর। রাস্তায় এক মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ির চালক দুর্ঘটনা ঘটায়। জনগণ সেই গাড়ির চালককে মারছিল। সিদ্ধার্থ তার জমানো ক্ষোভ ঝারে সেই গরীব চালকের উপর। গিয়ে সেও দুইএক ঘা বসায়। আমলাতন্ত্রের নাটবল্টু হওয়ার লোভের কারণে যে প্রতিবাদটাকে সে গিলে ফেলে, অবদমিত করে, সেটাই বেরিয়ে আসে রাস্তায় এক চালককে পিটিয়ে। এই হচ্ছে সত্যজিতের ‘চিত্তাকর্ষক’ চরিত্র সিদ্ধার্থ।

ভিন্ন এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ বলছেন, ‘তা ছাড়া সেও (সিদ্ধার্থ) প্রতিবাদের কাজটি করে তার ব্যক্তিগত স্তরে যা আমার কাছে একটা দারুণ ব্যাপার, কেন না এটা আসছে তার অন্তর থেকে, কোনো রাজনৈতিক বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নয়।’ সত্যজিৎ কি করে জানলেন যে রাজনৈতিক বিশ্বাস মানেই সেটি অন্তর থেকে উৎসারিত নয়? তাছাড়া তিনি কি জানতেন না যে কোন কিছুই রাজনীতির উর্ধ্বে নয়? তিনি বোঝাতে চাইছিলেন সিদ্ধার্থ শেষ চাকরির সাক্ষাৎকারে অন্য চাকরি প্রার্থীদের হয়ে যে প্রতিবাদ করেছিল সেটাকে। সেই দৃশ্যে প্রত্যেককে কঙ্কাল দেখানোর বিষয়টি প্রশংসা করে বলতে চাই, কলকাতার বাইরে একটি চাকরি আগে থেকেই ঠিক ছিল বলেই সিদ্ধার্থ অতোটা সাহস দেখাতে পেরেছিল। সিদ্ধার্থ ওখানে কেবল ব্যক্তিমানুষ নয়, সে রাজনৈতিক জীবও বটে, নইলে চাকরিপ্রার্থীদের হয়ে চাকরিদাতাদের বিরুদ্ধে সে সোচ্চার হত না। সিদ্ধার্থ সেই মুহূর্তে নিজেকে একটি শ্রেণীর আওতায় নিজেকে আবিষ্কার করেছিল বলেই সোচ্চার হয়েছিল, সেই শ্রেণীর দুর্দশার দ্বারা সে প্রভাবিত হয়েছিল বলেই ওইরকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। চাকরি দেয়ার কথা বলে ডেকে এনে এতগুলো মানুষকে বসতে না দেয়া, গরমের মধ্যে একজন অজ্ঞান হয়ে গেল, সেদিকে নজর নেই, অথচ নিজেদের দুপুরের খাবারটা ঠিক সময়ে হওয়া চাই- চাকরিদাতাদের এসব দেখে খেপে উঠছিল উপস্থিত প্রার্থীদের অনেকেই। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সিদ্ধার্থের মাধ্যমে। আর যে নিজেকে কল্পনায় চে মনে করে সে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী নয়, সেটা বলা যাবে না। বলতে পারেন প্রচ্ছন্ন সমর্থন হয় তো আছে কিন্তু নিজে সক্রিয় হতে চায় না, যেহেতু সে আত্মকেন্দ্রিক।

পুরো ছবিতে সিদ্ধার্থ রোমান্টিক, কল্পনাপ্রবণ যুবক থাকলেও, আগেই বলেছি, আরেকটি চাকরির প্রস্তাব হাতে থাকার কারণেই অমন ক্ষোভ দেখাতে পেরেছিল সিদ্ধার্থ। আদতে টুলুর মত সাহস তার নেই। যদি কলকাতার বাইরে চাকরির বিষয়টি পাকা না থাকত এবং ওইরকম অনিশ্চয়তার মধ্যে যদি সিদ্ধার্থ ঘটনাটি ঘটাতো তাহলে বলা যেত শেষ পর্যন্ত সিদ্ধার্থ প্রতিবাদ করেছিল। তা কিন্তু হয় নি।

সিদ্ধার্থ শেষ পর্যন্ত সত্যজিতের মতই রাজনীতি থেকে দূরে থাকা মানুষ। এক দৃশ্যে যেমনটা দেখা যায় সুউচ্চ ভবনের ছাদে প্রেমিকা কেয়ার সাথে ভবিষ্যতের কথা বলছে সিদ্ধার্থ। আর নিচে ময়দানে হচ্ছে রাজনৈতিক জনসভা, সেখানে জমায়েত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। সেসব দিকে সিদ্ধার্থের খেয়াল নেই, তারা নিমগ্ন ব্যক্তিবাদী টুকরো টুকরো সমস্যা আর হতাশা নিয়ে। সিদ্ধার্থের কাছে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির সুখ স্বাচ্ছন্দ ও মরে যাওয়াটাই মূখ্য। মাঝখানের সবকিছুই যেন এক ক্ষণস্থায়ী ব্যাপার। শেষ দৃশ্যের আগে সিদ্ধার্থ যখন চাকরির সাক্ষাৎকারে ভাংচুর করে বেরিয়ে যাচ্ছে তখন ক্যামেরায় দ্রুত ট্র্যাক শট হচ্ছে- সেখানে পেছনের দিকে চলে যাচ্ছে দেয়ালে লেখা রাজনৈতিক বক্তব্য, মাও সেতুঙের চেহারা, শহরের মানুষ, গ্রাম সবকিছু। কোথায় গিয়ে শেষ হচ্ছে ছবিটি? সারা ছবিতে যে পাখির ডাক বারবার ফিরে আসে সিদ্ধার্থের কল্পনায়, সেই আশৈশবের পাখির ডাক আর এক শবযাত্রায়। একদিকে পাখির ডাক, অন্যদিকে ‘রাম নাম সৎ হ্যায়, রাম নাম সৎ হ্যায়’। মানে মানুষ পাখির ডাকের মত এক মায়াকে সঙ্গী করেই বাঁচে এরপর খাটিয়ায় ওঠে ভস্ম হওয়ার জন্য। মাঝের কোন কিছুই স্থায়ী নয়, ঘটে যাওয়া ঘটনা মাত্র।

অন্যদিকে উপন্যাসের সমাপ্তিটা চলচ্চিত্রের থেকে অনেক বেশি দ্রোহের মন্ত্রে উজ্জীবিত। প্রতিশোধ নিতে উন্মুখ সিদ্ধার্থের দেখা পাওয়া যায় সুনীলের উপন্যাসের শেষ অঙ্কে। সেখানে সিদ্ধার্থ ভাবছে, ‘ইন্টারভিউয়ের সেই লোকগুলো, চিবিয়ে-চিবিয়ে কথা বলছিল- আমি ওদের সবশুদ্ধ ধ্বংস করে দেবো, ওই বাড়িটা পর্যন্ত ধুলোয় গুঁড়ো করে ফেলবো, বাদল আর তার দুই সঙ্গী,… অনন্ত সান্যাল- ওর চোখ দুটো আমি উপড়ে নেবো, চেনে না আমাকে, সেই পুলিশ অফিসারটা, এমনকি কেয়ার বাবাও যদি ঘুষখোর হয়- সব্বাইকে দেয়ালে দাঁড় করিয়ে দিয়ে রাইফেল হাতে নিয়ে… দেখে নিয়ো, ঠিক আমি ফিরে আসবো!’

এমন হুমকি দিয়েই শেষ হয় উপন্যাস। এখানে চলচ্চিত্রের মত সিদ্ধার্থের চাকরি আগে থেকে ঠিক করা ছিল না। তাই বলা যায় উপন্যাসের সিদ্ধার্থ ভেতরে ভেতরে যে আগুন পুষে রাখছে শেষোব্দি, চলচ্চিত্রে কিন্তু আগুন নিভে একেবারে মাটি- মানে ‘রাম নাম সৎ হ্যায়, রাম নাম সৎ হ্যায়।’

চার.

সীমাবদ্ধ ছবির একটি দৃশ্যশংকরের উপন্যাস ‘সীমাবদ্ধ’ থেকে একই নামে ছবি নির্মাণ করেন সত্যজিৎ রায়। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭১ সালে। তখন প্রতিবেশী দেশে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে। লাখ লাখ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। আর পশ্চিমবঙ্গের ভেতরে চলছে নকশালপন্থী সিপিআই-এমএলের সশস্ত্র সংগ্রাম, তাদের দমনে প্রশাসন কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে। মারা পড়ছে বহু তরুণ। ঠিক সে সময়ে, মানে ২৪ সেপ্টেম্বরে মুক্তি পায় ‘সীমাবদ্ধ’। ছবিটি এমন এক ছবি যেখানে কলকাতা শহরের বেকারত্বের বিপরীতে শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জি নামের এক তরুণ যোগ্যতা ও ভাগ্যের বলে একটি কোম্পানির ডিরেক্টর হওয়ার গল্প বলা হয়। গল্পে দেখানো হয় এই তরুণ পদোন্নতি ও সামাজিক মর্যাদার লোভে হীন কাজ করতেও পিছ পা হয় না।
শ্যামলের এই চরিত্রটি ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছবির সিদ্ধার্থের একেবারে বিপরীত। বিপরীত এই অর্থে যে সিদ্ধার্থ বেকার, চাকরির জন্য রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে সে পুরো ছবিতে। আর শ্যামল মধ্যবিত্ত হলেও ছাত্র ভাল হওয়ার কারণে চাকরি শুধু বাগিয়ে নেয়নি, সেই চাকরির শীর্ষ স্থানেও পৌঁছে যায় সে। সিদ্ধার্থ যেখানে বামঘেষা, শ্যামল সেখানে কোন রাজনীতির সঙ্গেই নেই। সিদ্ধার্থ নিজের পায়ের তলায় মাটি থাকলে অন্যের জন্য প্রতিবাদ করতে জানে, অপরদিকে শ্যামল নিজের পায়ের তলায় মাটি ফিরিয়ে আনতে অন্যের জীবনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিতেও কুণ্ঠা বোধ করে না।

মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত হওয়ার আকাক্সক্ষা শ্যামলেন্দুর ভেতর যেমন তীব্র তেমনি একই বাসনা ধারণ করে তার স্ত্রী দোলন চাঁপা। তাদের একমাত্র পুত্র রাজা তাদের সঙ্গে থাকে না, থাকে বোর্ডিংয়ে। এমনকি শ্যামলেন্দুর বয়স্ক মা-বাবারও ঠাঁই হয়নি আধুনিক বড় ফ্ল্যাটটিতে। হবে কিভাবে? সামাজিক মর্যাদা বজায় রাখতে যে ফ্ল্যাটে মাঝে মাঝে অন্য উচ্চাকাঙ্ক্ষীদের দাওয়াত দিতে হয়, পানাহার করতে হয়! তেমনই এক পানাহারের সন্ধ্যায় আলাপ ওঠে কি হচ্ছে কলকাতা শহরে? এই শহরের ‘গণ্ডগোল’ কি করে দূর করা যায়? কলকাতা তো ডুবতে বসেছে! মানে যুবআন্দোলনকেই ইঙ্গিত করা হচ্ছে এখানে। তখন একজন বলল, ‘ওদের ধরে ধরে চাকরি দিয়ে দাও,’ প্রত্যুত্তরে আরেকজন বলল, চাকরি দিয়েই বা লাভ কি, সেখানেও একটা ইউনিয়ন করে বসবে। শ্যামলেন্দু বলছে, ওদের বক্তব্য হল পুরো ব্যবস্থাটাই পঁচে গেছে, ওরা চাকরি চায় না। শ্যামলেন্দুর মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে আরেকজন বলল, ওরা বিপ্লব চায়। তৃতীয় ব্যক্তি বলছে, এখন দরকার ডিক্টেটর। শ্যামলেন্দু তর্ক চালিয়ে যাচ্ছে, বলছে, তরুণদের মধ্যে এই যে একটা অনাস্থা, এটা তো একটা ইউনিভার্সেল ব্যাপার। তখন ওই তৃতীয় ব্যক্তি মানে সৌমেন একটু খেপে বলল, ইউনিভার্সেল মাই ফুট! বিদেশে একটা কিছু চলছে সেটারই অনুকরণে এখানে কিছু চলছে। ওরাও করছে, আমরাও করছি। তখন শ্যামল দেশভাগের আগের ছাত্রনেতা আর পরের ছাত্রনেতাদের মধ্যে পার্থক্য আছে বলে মন্তব্য করে। শ্যামল কি তবে যুববিদ্রোহের পক্ষে কথা বলছে? সৌমেনের এমন প্রশ্নের জবাবে শ্যামল আর কোন উত্তর দেয় না।

এই কথোপকথনের ভেতরেই টুটুল, শ্যামলেন্দুর শ্যালিকা, যে কলকাতায় বহুদিন পর বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে তার প্রতিক্রিয়া দেখান সত্যজিৎ। ঘটনাক্রমে দর্শক জানতে পারে টুটুল যে ছেলেটিকে ভালোবাসে সে বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত। তাই ওই আলাপে যুববিদ্রোহকে যখন খাটো করা হচ্ছিল বিষয়টি ভালো ভাবে নেয়নি টুটুল। ব্যাস অতোটুকুই। এছাড়া আর কোন জায়গায় কলকাতার তখনকার রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে সেভাবে কোন আলাপ নেই, কোন ঘটনাও দেখানো হয় না। শুধু আরেক জায়গায় বলা হয়, মাঝে মধ্যেই দুমদাম বোমাটোমা ফুটছে শহরে। কারা ফুটাচ্ছে সেটা দর্শক আন্দাজ করে নেন। অবশ্য ক্রিশ্চিয়ান থমসনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ নিজেই খোলাসা করেছেন বিষয়টিকে। তিনি বলেন, ‘ওই বোমা বিস্ফোরণগুলি হচ্ছে বামপন্থীদের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের লড়াই। … তারা সত্যিকার লক্ষ্য বস্তুগুলিকে আক্রমণ করত না, যেমন বৃহৎ শিল্পপতিদের বিরুদ্ধে বোমা ছুড়ত না, কেন-না তাতে তাদের কিছু হারাবার ভয় ছিল, বরং তারা নিজেদের মধ্যেই লড়ত।’

এটা কি সত্যজিতের ক্ষোভ যে বামপন্থীরা বড় শিল্পপতিদের উদ্দেশ্যে বোমা ছুড়ত না? একথা থেকে মনে হয় সত্যজিৎ শিল্পপতিদের প্রতি বেশ খাপ্পা। কিন্তু এই ‘সীমাবদ্ধ’ ছবিতেই দেখুন না অভিজাত শ্রেণীর বিলাসি জীবন দেখানোতেই যেন আনন্দ নির্মাতার। পুরো ছবিতে কলকাতার অভিজাত কর্পোরেট সমাজের ক্লাব, ক্যাবারে নাচ, বিউটি পার্লার, পার্টি, শাড়ি, পদোন্নতি, রেসের ময়দান, জুয়া ইত্যাদি দিয়ে ঠাসা। কোথায় মূল উপন্যাসে তো টুটুল কলকাতার পথেঘাটে ঘুরে বেড়ায়। সে দেখে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের কলকাতাকে, সে দেখে বামপন্থী আন্দোলনের কলকাতাকে। কোথায় সেসব দৃশ্য? টুটুলকে কেন শুধু ঘোড়ার দৌড়, মদের পার্টি আর ক্যাবারে নৃত্যের আসরে দেখা যায়? কোন শ্রেণী অবস্থানের কারণে রাজনীতি বিমুখ সত্যজিৎ টুটুলকে এভাবে বড় পর্দায় তুলে ধরেছেন?

রেসের ময়দান ঘোড়ার দৌড়ের মত শ্যামলেন্দু যেন উচ্চবিত্ত হওয়ার দৌড়ে লিপ্ত। একই রকম মেটাফোর পাওয়া যায় শেষের দিকেও, সেই সিঁড়ি বেয়ে ওঠার দৃশ্যে। সেখানে অবশ্য সে উঠতে উঠতে ক্লান্ত। তো শ্যামলেন্দুর এই উপরে ওঠার ব্যাপারটি কিন্তু শ্যালিকা টুটুল বেশ উপভোগই করে বলা যায়। কিন্তু টুটুল প্রথমে বুঝতে পারেনি তার পূর্ব পরিচিত এই শ্যামলেন্দু নিজের সুনাম অক্ষুণ্ন ও পদোন্নতির লোভে অসৎ কাজও করতে পারে নির্দ্ধিধায়। সে কারখানাতে গণ্ডগোল বাঁধিয়ে দেয়, যার ফলে ডাকা হয় কৃত্রিম ধর্মঘট। এই ধর্মঘটের এক ফাকে কারখানায় শ্যামলেন্দুর ইশারাতেই ফাটানো হয় বোমা। এতে আহত হয় কারখানার এক পুরনো দারোয়ান। আরেকটু হলে বেচারা মরতেই বসেছিল। কিন্তু তাতে কি? এই গণ্ডগোলের কারণে কারখানা লক-আউট করা হয়, সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন। এতে কারখানারই লাভ হয়। কারণ চালানের কয়েকদিন আগে পাখায় কিছুটা সমস্যা ধরা পড়ে। আর এতে বাতিল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় হাজার হাজার পাখার রপ্তানি আদেশ। এমন অবস্থায় একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ক্রেতাদের বোঝানো হয় কারখানায় ঝামেলা চলছে। মাল পাঠাতে দেরি হবে। এই দেরি মানে কিছুটা সময়, এরই মধ্যে পাখার ত্রুটি সারিয়ে ফেলা যাবে। এমন চালে খুশিই হয় কারখানা কর্তৃপক্ষ, পুরস্কৃত হয় শ্যামলেন্দু। বহু আকাক্সিক্ষত পরিচালকের পদ পেয়ে যায় সে। কিন্তু শ্যালিকা টুটুল, যার সঙ্গে শ্যামলেন্দুর ভালো লাগার একটি সম্পর্ক ছিল, তার চোখে সে ধরা পড়ে যায়। লজ্জা পায় শ্যামলেন্দু। টুটুল ফিরিয়ে দেয় শ্যামলেন্দুর ধার দেয়া ঘড়িটি। এই লজ্জা পাওয়ার ভেতর দিয়েই শেষ হয় ছবিটি।

১৯৭০ সালে প্রকাশিত ‘কলকাতা’ নামের এক পত্রিকায় সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘এখানকার ছাত্র বিক্ষোভের বিশেষ কোন চেহারা নেই- অনেকগুলো চেহারা মিশে আছে।’ পরবর্তীকালে ‘সীমাবদ্ধ’ ছবিতে এই চিন্তার প্রতিফলন আমরা পেয়েছি, ওই পানাহার দৃশ্যে। একই সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ আরো বলছেন, ‘রাজনৈতিক চেতনা বলতে তো রাজনীতি যারা করে তাদের ব্যর্থতার চেতনাও হতে পারে- যা ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এখন। রাজনীতি সম্বন্ধে একটা ডিসিলিউশমেন্ট ছাড়া তো আর কিছু হতে পারে বলে মনে হয় না। ইন জেনারেল, রাজনীতি বলতে আমরা যেটা বুঝি এবং রাজনীতি যারা করছে সে সব লোকের চেহারা আমরা প্রায়ই দেখি আর কি- আমার মনে হয় আশেপাশে কী ঘটছে সে সম্বন্ধে ভীষণভাবে একটা সচেতন হওয়া দরকার।’

যে রাজনীতির ভেতর দিয়ে ষাট কি সত্তরের কলকাতা যাচ্ছিল সেই রাজনীতিতে আস্থা ছিল না সত্যজিতের, তাই বলছিলেন মোহভঙ্গের কথা। কিন্তু কোন মোহ, কাদের মোহ? কাদের রাজনীতি ভালো লাগছিল না সত্যজিতের? কংগ্রেসের না তিন বামপন্থী দলের? আসলে গোটা রাজনীতিকেই তিনি পছন্দ করতেন না। ১৯৭২-৭৩ সালে প্রকাশিত সাইট অ্যান্ড সাউন্ড পত্রিকার সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, ‘আমি কখনই রাজনৈতিক বিষয়ে অজ্ঞাত ছিলাম না। কিন্তু আমি ইচ্ছে করেই আমার ছবিতে রাজনৈতিক বিষয় আনিনি।’ রাজনীতির প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই ‘সীমাবদ্ধ’ ছবিতে সৌমেন বিপ্লবী তরুণদের অবস্থানকে ‘মাই ফুট’ বলেন, একই কারণে টুটুলের যে প্রেমিক, রাজনৈতিক কর্মী, তাকেও নির্মাতা রাখেন দৃষ্টির আড়ালে। ঠিক একই কারণে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছবিতে সিদ্ধার্থের ছোট ভাইকেও করে রাখা হয়েছিল একটি পার্শ্ব চরিত্র মাত্র। রাজনৈতিক বিষয় তো পছন্দ করতেনই না, থমসনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে, সত্যজিৎ সরাসরিই বলেছিলেন, ‘আমি বামপন্থায় বিশ্বাস করি না।’ তারপরও জ্যোতি বসু বলেছিলেন সত্যজিৎ বামপন্থী ছিলেন কি না তা তিনি জানেন না, তবে প্রগতিশীল ছিলেন! ভুলে গেলে চলবে না যখন নকশালবাড়ি আন্দোলন তুঙ্গে এবং যুববিদ্রোহ দমনের নামে তরুণ বামপন্থী নেতাদের প্রশাসনিকভাবে হত্যা করা হচ্ছে তখন কিন্তু এই জ্যোতি বসু পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের ডেপুটি চিফ মিনিস্টার। সত্যজিৎ যে অন্তত পক্ষে নকশালপন্থী সিপিআই-এমএলের পক্ষে কথা বলেননি সেজন্যই বোধহয় ‘প্রগতিশীল’ তকমাটি ব্যবহার করেছিলেন জ্যোতি বসু।

পাঁচ.

জন-অরণ্য’র একটি দৃশ্যশংকরের আরেকটি উপন্যাস ‘জন-অরণ্য’ নিয়েও চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সত্যজিৎ রায়। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া সেই ছবিটি শুরু হয় একটি পরীক্ষাকেন্দ্রের দৃশ্য দিয়ে। কেন্দ্রের বা কলেজের দেয়ালে নকশালবাদী সিপিআই-এমএলের বিভিন্ন স্লোগান, যেমন: ‘সশস্ত্র বিপ্লবই সর্বহারাদের একমাত্র পথ’, ‘শ্রেণীশত্রু খতম করো’, ‘সত্তরের দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করো (CPI (ML))’ ইত্যাদি। আরো আছে মাও সেতুংয়ের মুখের স্টেনসিল। এমন রাজনৈতিক স্লোগান লেখা পরীক্ষাকেন্দ্রে চলছে গণ নকল, নকলের মহোৎসব আর কি! এবং শিক্ষকদের মুখ ভার, বোঝা যাচ্ছে তারা ভীত। একজন শিক্ষক যখন নকলের বহর দেখে জিজ্ঞেস করে ‘কী হচ্ছে ভাই?’ তখন নকলবাজ ছাত্রদের একজন ব্যঙ্গ করে বলল, ‘পরীক্ষা হচ্ছে স্যার’। সব ছাত্র তখন হো হো করে হেসে ওঠে। পুরো পরিস্থিতি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় সেখানে, যা দেখে যে কারো মনে হবে এসব ছাত্র সিপিআই-এমএলের রাজনীতি করে। এই পরীক্ষাকেন্দ্রটি তাদেরই দখলে। ফলে এখানে কোন নিয়মকানুন চলবে না। মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী দলটি সম্পর্কে প্রথমেই এমন একটি নেতিবাচক মনোভাব দিয়ে শুরু হয় সত্যজিতের ‘জন-অরণ্য’।

এই ছবির নায়ক সোমনাথ প্রথম দৃশ্যে, মানে সেই গণটোকাটুকির সময়ে বেশ সৎভাবে পরীক্ষা দেয়, কিন্তু চোখে ভালো দেখে না, নতুন চশমা কেনার টাকাও নেই এমন এক দরিদ্র পরীক্ষকের হাতে সোমনাথের ঘিঞ্জি আর ছোট অক্ষরে লেখা পরীক্ষার খাতাটি পরে। এতে ওই শিক্ষক গড়পরতা একটা নম্বর দিয়ে দেয়। ব্যাস এখান থেকেই শুরু হয় সোমনাথের হতাশা। সত্যজিৎ যেন সোমনাথের এই হতাশার দুটি কারণ নির্দেশ করলেন- এক যারা স্লোগান সম্বলিত কেন্দ্রে নকল করে পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফল করলো আর অন্যটি হল পরীক্ষকের দারিদ্র্য। এদিকে সোমনাথের বৃদ্ধ বাবা সোমনাথের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করেও যখন চাকরি মিলছে না তখন সোমনাথেরই এক বন্ধু সুকুমার তাকে নিয়ে যায় পূর্ব পরিচিত এমএলএ’র কাছে। এই রাজনৈতিক নেতার পেছনে দেয়ালে টাঙানো ছিল ইন্দিরা গান্ধীর ছবি।

করুণাশঙ্কর রায়ের নেয়া এক সাক্ষাৎকারে, যা ‘কলকাতা’ পত্রিকায় বেরিয়েছিল ১৯৭০ সালে, সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘পলিটিশিয়ানস অ্যান্ড হোল গেম অব পলিটিকস খুব ডিজনেস্ট- খুব ছেলেমানুষি (মনে হয়)। বহুরূপীর মতো রঙ বদলাচ্ছে, প্রায় খেই হারিয়ে যেতে হয়।’ রাজনীতিবিদদের ছেলেমানুষ ভাবার বহিঃপ্রকাশই ঘটে সেই এমএলএ’র চরিত্রে। দেখবেন এই ব্যক্তিটি যেভাবে কথা বলছেন, যা বলছেন সবটাই একটা ক্যারিকেচার। এটি একটি কমেডি দৃশ্য। এমনভাবে রাজনীতিবিদদের হেয় ও ব্যঙ্গ করার বিষয়টি এক শ্রেণীর অভিজাত দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আসে। তারা মনে করেন রাজনীতি যারা করেন তাদের কোন দাম নেই। অবশ্য এই মনে করার দায় যে রাজনীতিবিদদের একদম নেই সেটাও বলা যায় না। তবে রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের ছাড়া রাষ্ট্র চলবে কি? এমন প্রশ্নের উত্তর সত্যজিৎ কোথাও দিয়েছেন কি না জানি না। তবে এটা বোঝা যায়, সত্যজিৎ রাজনীতি এড়িয়ে চলা মানুষ। কিন্তু চাইলেই কি রাজনীতিকে এড়িয়ে চলা যায়?

সোমনাথের বাবা লাখ লাখ বেকার যুবকের সাথে নিজের ছেলে সোমনাথকে মিলিয়ে যখন বুঝতে পারেন কেন তখনকার ছেলেরা বিপ্লব করার চেষ্টা করছে তখন সোমনাথের বড় ভাই ভোম্বল বলে, বিপ্লব আর চলবে না, সব বিপ্লবীদের মেরে ঠাণ্ডা করে দিচ্ছে। সোমনাথের বাবা তারপরও জানতে চায়, ওদের আদর্শ-তত্ত্বটা কি? কিসের জোরে ওরা প্রাণ দিতে ভয় পাচ্ছে না? সমকালের ভাবনা তিনি ভাবছেন, অন্যদিকে সোমনাথের কি হবে সেটা নিয়েও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, যেহেতু পরীক্ষার ফলাফলটি ভালো হয়নি। ছেলের এমন অবস্থা দেখে একদিন বয়স্ক মানুষটি বলেই বসলো, ‘এখন দেখছি বাঁচার দুটি মাত্র পথ আছে, হয় নষ্ট হয়ে যাও, নয় বিপ্লব করো।’ এই কথা শুনে সোমনাথের বৌদি শ্বশুড়কে বলেন, সে যে এসব কথা বলছে, ছেলে যদি ওসব রাজনীতিতে জড়িয়ে যায় তার কি ভালো লাগবে? তখন সোমনাথের বাবা বলে, সন্তানের প্রাণ সংশয় হলে কারই বা ভালো লাগে? ভোম্বলের ব্যাপারে তার এসব ভাবনা আসেনি, সোমনাথের যে রেজাল্ট সেজন্যই এসব ভাবনা আসছে।

বিষয়টি বেশ পরিষ্কার, সোমনাথের ফলাফল যদি ভালো হত তাহলে বিপ্লবের কথা মাথাতেই আসত না বাবার, এটা অনেকটা সেই ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র সিদ্ধার্থের মত। চাকরিবাকরি পাওয়া যাচ্ছে না তাই বিপ্লব দরকার। কিন্তু গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে আমূল পাল্টে দেয়ার ধারণাটি তাদের মধ্যে কাজ করে না, তারা সমাজের সুবিধাভোগ করতে চায় শুধু কিন্তু সমাজ পাল্টানোর সংগ্রামে সামিল হতে চায় না। তারা চায় তাদের হয়ে বিপ্লবটা অন্যরা করে দিক, তারা সুফলটা ভোগ করবে। শ্রেণী বিভক্ত সমাজে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কারণে খুব কম সংখ্যক মানুষের হাতে যে সম্পদ জমা হয় সেকারণেই দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ে, আর একারণেই এই ব্যবস্থার অবসান দরকার, বিপ্লব দরকার- এই ভাবনা সিদ্ধার্থের যেমন নেই, সোমনাথের বাবার নেই আর সোমনাথের তো নেইই।

সোমনাথ পরীক্ষা সততার সঙ্গে দিলেও ঠিকই পরে কলার খোসায় পা পিছলায় এবং তার পতন হয়, আক্ষরিক ও নৈতিক- দুই অর্থেই। বলছি বিশু দাদা বলে ভদ্রলোকের সঙ্গে তো পা পিছলে পড়েই দেখা হয় সোমনাথের। সেখান থেকে দালালি শুরু, এরপর অর্থের জন্য বন্ধু সুকুমারের বোনকেও অন্যের হাতে তুলে দিতে তার বাধে না। একটু অস্বস্তি হয় বটে তবে শেষ পর্যন্ত সে দালালিটাই গ্রহণ করে নেয়, যেহেতু তার মানসিক শক্তি নেই বিপ্লবী হওয়ার, শারীরিক শক্তি নেই কারখানার মজুর হওয়ার তাই দালালিটাই তার জন্য বরাদ্দ। এমন এক ‘অকাট্য’ যুক্তি তার সামনে হাজির করে নটবর মিত্র। এই যুক্তি সোমনাথ মেনেও নেয়, কারণ সে জানে আপোস করলে আর্থিক লাভ আছে। নীতি বর্জন করে সোমনাথ ঘরে ফিরে আসার পর সত্যজিৎ আমাদের শোনান ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’, কিন্তু এই ছায়া কেন ঘনিয়ে এলো সেটার কারণ আর ব্যাখ্যা করেন না তিনি। যদিও এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ বলছেন, ‘আমি মনে করি না কোন শিল্পীর পক্ষে এটা খুব একটা দরকার বা জরুরী অথবা তার বলার কোন অধিকার আছে, যে এটা ঠিক, ওটা ভুল।’ তিনি এটাও বলেছেন, ‘একজন শিল্পী হিসেবে আমি প্রচারক হতে চাই না।’ কিন্তু বাস্তবতা হল আপনি না চাইলেও আপনার সৃষ্টি কিছু না কিছু প্রচার করে। আপনার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আপনার রাজনৈতিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি দুটোই প্রচার হয়ে যায়। সৃষ্টির মধ্য দিয়েই কোন না কোন ভাবনাকে হয় আপনি পুনঃউৎপাদন করেন, নয় তো কোনোটাকে বাতিল করেন। আপনার উৎপাদিত সৃষ্টির গ্রহণ ও বাতিল করার প্রবণতা থেকেই প্রকাশিত হয় আপনার রাজনৈতিক অবস্থান। এই অবস্থানের কারণেই ছবিতে আড়ালে রয়ে যায় কলকাতার তৎকালীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধঃপতনের পেছনে আসলে কারা দায়ী। তিন বামপন্থী দল নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে- এটা বলে সত্যজিৎ পুরো সমস্যাটিকেই পাশ কাটিয়ে গেলেন।

ছয়.

আগেই বলেছিলাম সত্যজিৎ রায় রাজনীতিবিমুখ উদারনৈতিক ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদে বিশ্বাসী। উল্লিখিত তিন চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই সেটা প্রকাশিত। কলকাতায় যখন রাজনীতির ময়দান আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়েছে, যখন পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথেও খুব একটা ভালো সময় যাচ্ছে না ভারতের ঠিক সেসময়ের পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে, ওই কাছাকাছি সময়েই সত্যজিৎ দর্শকের সামনে হাজির করেন তিনটি চরিত্র- সিদ্ধার্থ, শ্যামলেন্দু ও সোমনাথ। এই তিন চরিত্রই গা বাঁচিয়ে ভালো থাকার পক্ষপাতী, অনেকাংশে নিজের ভালোর জন্য অন্যের ক্ষতি করতেও কসুর করে না তারা। তারা চায় সমাজের ভালোটা অন্যে করে দিক, সেই ভালোর ফল তারা ভোগ করবে। সিদ্ধার্থ মনে করে বিপ্লব হওয়া দরকার, কারণ এতে তার বেকারত্ব দূর হবে। শ্যামলেন্দু মনে করে তার উন্নতির জন্য অন্যে মূল্য দিক, তার বাসনা পূরণ হলেই হলো। সোমনাথ ব্যর্থ হতে চায় না, বেকার থাকতে চায় না, সে চায় অর্থ, ধনী হতে চায় সে, এতে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বোনকে যদি অন্যের হাতে তুলে দিতেও হয় তাতে তার নীতিতে বাধে না। ব্যক্তির সুখস্বাচ্ছন্দই মূখ্য এই তিন চরিত্রের কাছে, সত্যজিতের কাছেও।

সাউট অ্যান্ড সাউন্ড পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ রায় বলছেন, ‘আমার বিশ্বাস ব্যক্তিতে ও ব্যক্তিগত ধারণায় ন্যস্ত, সামগ্রিক চিন্তাধারা বা আদর্শ যা ক্রমশঃ পরিবর্তিত হয়, তাতে নয়।’ সত্যজিৎ পরিবর্তিত আদর্শে বিশ্বাস করেন না। এটা তো মৌলবাদী আচরণ। যে আদর্শ যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হয় না সে তো আর জীবন্ত আদর্শ থাকে না, শবদেহে পরিণত হয়। এখন ধরুন মার্ক্সবাদ যদি পরিবর্তন না হয় সময়ের সাথে তাহলে তো এটি ধর্মে পরিণত হবে। আবার গণতন্ত্র একটি ধারণা, এই ধারণা যদি স্থানকালপাত্রের ভেদে পরিবর্তন না হয় তাহলে তো সেটি স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত হবে। রাজনীতি সমগ্রের জন্যই হয়, সমগ্রের জ্ঞান নিয়েই মানুষ সামনের দিকে বাড়ে, মানবজাতির উন্নয়ন হয়। ব্যক্তির কোন একার জ্ঞান থাকতে পারে না। এই যে ভাষা- এটা কি ব্যক্তির, না সমগ্রের? ভাষা ছাড়া যেমন মানুষ হয় না, তেমনি সমগ্র ছাড়াও ব্যক্তি হয় না। ব্যক্তি সমগ্রের এক ভিন্ন প্রকাশ মাত্র। কিন্তু সত্যজিৎ ব্যক্তি আর সমগ্রকে আলাদা করে বুঝতে চাইলেন। আস্থা রাখলেন ব্যক্তিগত ধারণায়। ব্যক্তিগত ধারণা তো সমষ্টি চিন্তারই মিথষ্ক্রিয়া সেটা কি সত্যজিৎ ধরতে পারেননি? সেই একই সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ বলছেন, ‘আমি ব্যক্তিগত অভিব্যক্তিতে ভীষণ বিশ্বাসী। আমি শিল্পকে বুঝেছি সৃজনী ব্যক্তিত্বের প্রকাশ হিসেবে।’ ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি থাকতে পারে, কিন্তু সেটি কি সমগ্র থেকে বিচ্ছিন্ন? বিচ্ছিন্ন নয়, তারপরও জোর করে ব্যক্তির দুঃখ, কষ্টকেই বড় করে দেখানো, সেটারই একক বিজ্ঞাপন করা রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার নমুনাকেই হাজির করে, আর সমগ্রকে অস্বীকার করা প্রবণতাকে বিজ্ঞাপিত করে। এই ঘটনাই ঘটেছে সিদ্ধার্থ, শ্যামলেন্দু ও সোমনাথের জীবনে।

উল্লিখিত তিন চরিত্র যেমন কলকাতার রাজনীতি, মানুষ, সংগ্রাম কোন কিছু নিয়েই তেমন একটা ভাবিত নয়, তেমনি সত্যজিৎ রায়ও নিজের জগৎ নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন পঞ্চাশ, ষাট বা সত্তরের দশকে। তখনকার সময়ে সত্যজিতের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তরে সত্যজিৎ বলেন, সেসময় কি হচ্ছে না হচ্ছে সেদিকে তিনি মনোযোগই দেননি। কারণ তখন তিনি শিল্প নিয়েই বেশি ব্যস্ত। একদিকে সিনেমা তো ছিলই, অন্যদিকে সঙ্গীত, বিজ্ঞাপনের জগৎ, টাইপোগ্রাফি, বুক ডিজাইন ইত্যাদি নিয়ে তিনি ডুবে ছিলেন। এক্ষেত্রে সত্যজিৎ যেন আগন্তুক, কলকাতার বাসিন্দা নন তিনি, তাই কলকাতার উপর দিয়ে ঝড়ঝঞ্ঝা বয়ে গেলেও সেটাকে তিনি নিজের সমস্যা বলে বিবেচনা করেন না। তিনি মেতে থাকেন নিজেকে নিয়েই। এই যে নিজের দেশ ও সমাজের সঙ্কটকালে শিল্প নিয়ে মেতে থাকা, মানুষকে নিয়ে না ভেবে ব্যক্তিকে নিয়ে ভাবা এবং সেভাবেই নিজের শিল্পসৃষ্টি করা, এটাই কলাকৈবল্যবাদ। এই বাদের খপ্পরে পড়ার কারণেই সত্যজিৎ তাঁর সময়ের অন্য নির্মাতাদের চেয়ে একটু যেন পিছিয়ে পড়েছেন। কতটুকু পিছিয়ে পড়েছেন সে আলোচনা ভিন্ন, তবে এটুকুই বলা যায় সত্যজিৎ মানুষের জন্য যতটা না সৃষ্টি করেছেন, তারচেয়ে বেশি সৃষ্টি করেছেন শিল্পের জন্যই, মনের আনন্দেই তিনি নানা বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। সেখানে রাজনৈতিক কোন অঙ্গীকার ছিল না। সাক্ষাৎকারেও তিনি বলেছেন, নানা রকম বাজনা বাজিয়ে দেখার মতই নানা রকম বিষয়ের উপর তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। আর অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে ভিন্ন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমি মানুষের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। বক্তব্য প্রকাশের জন্য। আর আমি মনে করি সেটাই আমার পক্ষে যথেষ্ট অঙ্গীকার।’ সত্যজিতের এই ‘মানুষে’র ধারণাটি কেমন যেন অস্পষ্ট, উনি বোধহয় দর্শকদেরই বুঝিয়েছেন। কিন্তু দর্শকরূপী সামাজিক মানুষকে তিনি স্পর্শ করতে পারেননি।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী সত্যজিৎ রায়, যাঁর গুণের শেষ নেই, যিনি সেলুলয়েডে গল্পটা বলতে পারতেন মুন্সিয়ানা নিয়ে, সেই ব্যক্তিটি যে রাজনীতি বিমুখ ছিলেন বা বলতে পারেন অপছন্দই করতেন রাজনীতিকে তা মোটামুটি স্পষ্ট উপরের আলোচনা থেকে। কিন্তু তিনি উদারনীতিরও ছিলেন বটে। নাহলে শ্যামলেন্দু ও সোমনাথ যে অন্যায় করেছে সেটির প্রতি তেমন ক্রুদ্ধ হতে দেখা যায় না সত্যজিৎকে। অনেকটা যেন নিভৃতে ডেকে নিয়ে একটু বকে দিলেন, ব্যাস! শ্যামলেন্দুকে ঘড়িটি ফিরিয়ে দিয়ে লজ্জা দিল শ্যালিকা টুটুল, আর সোমনাথের বেলায় তো শুধু একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত- ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’। আর সিদ্ধার্থের বেলায় তো সত্যজিতের উদার হওয়ার সুযোগই ছিল না, তাই তাকে ও আমাদেরকে শুনিয়ে দিলেন ‘রাম নাম সৎ হ্যায়, রাম নাম সৎ হ্যায়’। কিন্তু আমরা তো জানি, মানুষ শুধু ভাত খেয়েই বাঁচে না, অপরের মুখ থেকে নিঃসৃত বা বলতে পারেন সমগ্রের কণ্ঠ থেকে আসা ভাষার উপরও তাকে নির্ভর করতে হয়। সত্যজিতের ব্যক্তিবাদ তাই ধোপে টেকে না বলেই বোধ হচ্ছে।

দোহাই

১. সুনীতি কুমার ঘোষ, নকশালবাড়ি: একটি মূল্যায়ন, পিপলস বুক সোসাইটি, ২০১০, কলকাতা

২. ‘বামপন্থী কিনা জানি না তবে প্রগতিশীল ছিলেন’, জ্যোতি বসুর নেয়া পরিমল ভট্টাচার্যের সাক্ষাৎকার, ঋতুপর্ণ ঘোষ সম্পাদিত ‘আনন্দলোক’, মে ১৯৯৮। আনন্দলোকের এই বিশেষ সংখ্যার নাম রাখা হয় ‘মানিকবাবু’

৩. শুভেন্দু দাশগুপ্ত, সত্যজিৎ রায়: নিজের কথায়, শীতলচন্দ্র ঘোষ অরুণকুমার রায় সম্পাদিত ‘সত্যজিৎ রায়: ভিন্ন চোখে’, ভারতী বুক স্টল, ২০০২, কলকাতা

৪. অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়, চলচ্চিত্র সমাজ সত্যজিৎ রায়, প্রতিভাস, ২০১২, কলকাতা

৫. নিজের আয়নায় সত্যজিৎ: দীর্ঘতম শেষ সাক্ষাৎকার, বদ্বীপ, ২০১২, কলকাতা

৬. সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, প্রতিদ্বন্দ্বী, দে’পাবলিশিং, ২০০২, কলকাতা

৭. শংকর, সীমাবদ্ধ, চলচ্চিত্রায়িত কাহিনীসংগ্রহ: ছায়াছবি, দে’পাবলিশিং, ২০১১, কলকাতা

৮. শংকর, জন-অরণ্য, চলচ্চিত্রায়িত কাহিনীসংগ্রহ: ছায়াছবি, দে’পাবলিশিং, ২০১১, কলকাতা

৯. John W. Hood, Beyond the world of Apu: the films of Satyajit Ray, Orient Longman, 2008, New Delhi.

(লেখাটি প্রকাশ হয় বাংলা ট্রিবিউনে ২৩ এপ্রিল ২০১৭ )

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: